মেয়েকে ওরা মেরে ফেলল, এখন মামলাও নিচ্ছে না পুলিশ’
নিজস্ব প্রতিবেদক :বসতভিটার শেষ সাড়ে সাত শতক জমিটুকু বিক্রি করার সময় মহেন্দ্র নাথ রায়ের বুকটা কেঁপেছিল ঠিকই, কিন্তু সান্ত¡না ছিল একটাই মাতৃহীন ছোট মেয়েটা সুখে থাকবে। তিন লাখ টাকা যৌতুকের মধ্যে আড়াই লাখ শোধ করেছিলেন বিয়ের আসরেই। ভেবেছিলেন, বাকি ৫০ হাজার টাকার জন্য বুঝি স্বজনেরা কোনোদিন হিংস্র হয়ে উঠবে না। কিন্তু সেই ৫০ হাজার টাকাই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল ১৭ বছরের রাধা রাণীর প্রাণ। রাধার গর্ভে থাকা চার মাসের অনাগত সন্তানটিও পৃথিবী দেখার আগেই পিষ্ট হলো যৌতুকের নির্মম বলিষ্ঠতায়। এই ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় রাঘবপুর গ্রামে।
বৃহস্পতিবার(১৬ এপ্রিল) বিকেলে রাধার বাবার বাড়ি পীরগঞ্জের জয়কুর গ্রামে সেই বিক্রি করে দেওয়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক জীর্ণ দশা। টিনের চাল আর চাটাইয়ের বেড়ার ঘরে অভাবের ছাপ স্পষ্ট। মহেন্দ্র নাথ এক ঘরে থাকতেন, পাশের ঘরে থাকত তাঁর আদরের রাধা। সেই ঘর আজ শূন্য।
রাধার বাবা মহেন্দ্র নাথ বলছিলেন, ‘মৃত্যুর মাত্র দুইদিন আগে স্বামী মিঠুনকে নিয়ে রাধা এসেছিল ওই বাকি ৫০ হাজার টাকার জন্য। আমি বলেছিলাম, বাবা আমি তো নিঃস্ব, একটু সময় দাও, দুই-তিন মাস পর ব্যবস্থা করে দিব। বসতভিটা বিক্রি করে বিয়ে দিয়েছি, এখন আমার জমিও নেই, মেয়েটাও রইল না।’
গত বছরের আগস্ট মাসে পীরগঞ্জের রাঘবপুর গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মিঠুন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় রাধার। তখন সে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। কাগজে-কলমে ১৮ দেখানো হলেও রাধার বয়স ছিল তখন মাত্র ১৬। বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
রাধার বড় ভাই সুভাষ চন্দ্র রায় ও ভাবি মানতা রাণীর অভিযোগ, বাকি টাকার জন্য রাধাকে প্রায়ই মারধর করা হতো, এমনকি দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা হতো। একথা জানলে বাবার কষ্ট বাড়বে, তাই শান্ত স্বভাবের মেয়েটি মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। ১৩ এপ্রিল সোমবার সকালে রাঘবপুর গ্রামে স্বামীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় রাধার নিথর দেহ। তাঁর স্বামীর পরিবার থেকে জানানো হয়, গলায় ফাঁস দিয়ে রাঁধা মারা গেছেন।
রাধার বাবার পরিবারের অভিযোগ আরও গুরুত্বর। পুলিশ লাশ উদ্ধারের করে ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করে ফেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ভাই সুভাষ চন্দ্র রায়ের আক্ষেপ, ‘আমার বোন আত্মহত্যা করেনি। তাকে যৌতুকের জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাশ সৎকারের সময় আমাদের জানানো পর্যন্ত হয়নি, আমরা শেষবারের মতো ওর মুখটাও দেখতে পারলাম না।’
রাধার মৃত্যুতে জয়পুর গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে শোকের মাতম। প্রতিবেশীরা জানান, ৯ বছর বয়সে মা কালোনি বালাকে হারানো রাধা ছিল অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র। গ্রামের কারো সঙ্গে কোনোদিন উচ্চস্বরে কথা বলেনি সে। সেই মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে এ কথা গ্রামবাসী বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের দাবি, গর্ভবতী একটি মেয়েকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।
মেয়ে হারানোর শোক নিয়ে বাবা মহেন্দ্র নাথ গিয়েছিলেন পীরগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে যৌতুকের জন্য নির্যাতনে তাঁর মেয়েকে মেরে ফেলার মামলা করতে। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। মেয়ের বিচার চেয়ে দিশেহারা এই বৃদ্ধ বাবার বলেন, ‘মেয়ে হত্যার বিচার কার কাছে চাইব? যৌতুকের জন্য মেয়েকে ওরা মেরে ফেলল, এখন মামলাও নিচ্ছে না পুলিশ।’
পীরগঞ্জ থানা পুলিশ মামলা নিচ্ছে না কেন? এ বিষয়ে শুক্রবার ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন ফোনে বলেন, ‘এবিষয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। যদি রাধার পরিবার মামলা দিতে চায়। পুলিশ অবশ্যই মামলা নিবে। মামলা নিতে কোনো বাধা নেই।’

