আদিবাসীদের কথা লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরতে চান মিলন মার্ডী
লেখক: শান্ত পাহান (ঠাকুরগাঁও)নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আদিবাসী মানুষের জীবন-সংগ্রামের কথা লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে চান নওগাঁর তরুণ আদিবাসী লেখক মিলন মার্ডী। নিজের শেকড়, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই লেখালেখিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
মিলন মার্ডী নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার শ্যামবাটি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর জন্ম ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে। ছোটবেলা থেকেই নিজস্ব সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও লেখালেখির প্রতি ভালোবাসায়।
আদিবাসী সমাজের মানুষের জীবনযাপন, সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, বৈষম্য, অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরতে চান মিলন মার্ডী। তাঁর কাছে লেখালেখি শুধু সৃজনশীলতার বিষয় নয়; এটি নিজের জাতিসত্তা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
পারিবারিক পরিচয়
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে মিলন মার্ডী বড়। তাঁর ছোট দুই ভাই পলাশ মার্ডী ও স্বপন মার্ডী জমজ। তাঁদের বড় বোনের নাম দুলালী মার্ডী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির নানা বিষয় কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
নিজের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তাঁকে সাঁওতাল সমাজের ভাষা, গান, ঐতিহ্য, উৎসব ও জীবনধারার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তোলে। সেই আগ্রহ থেকেই পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তিনি।
লেখালেখির মাধ্যমে আদিবাসী সমাজের কথা
মিলন মার্ডীর লেখালেখির অন্যতম প্রধান বিষয় আদিবাসী মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। তিনি মনে করেন, একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় শুধু তার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাদের ভাষা, গান, নৃত্য, পোশাক, উৎসব, লোকজ জ্ঞান, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যেও সেই পরিচয় বহন করে।
তাই হারিয়ে যেতে বসা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর স্বপ্ন, আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আরও বেশি চর্চা করবে এবং লেখালেখি, সংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয়কে শক্তিশালী করবে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়
লেখালেখির পাশাপাশি মিলন মার্ডী সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তিনি সাঁওতাল ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাঁওতাল ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
এছাড়াও তিনি কুকমু মিউজিক ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। সংগীতের মাধ্যমে সাঁওতাল সংস্কৃতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
মিলন মার্ডী বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নওগাঁর নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
নতুন প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন
মিলন মার্ডীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভুলে না যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে আদিবাসী ভাষা, গান, গল্প, কবিতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তরুণ প্রজন্ম যদি আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে হারিয়ে যেতে বসা অনেক ঐতিহ্য নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে অন্য সংস্কৃতিকে ছোট করা নয়; বরং নিজের পরিচয়কে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে অন্যের সংস্কৃতিকেও সম্মান করা।
লেখক হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
মিলন মার্ডী ভবিষ্যতে নিয়মিত আদিবাসী বিষয়ক লেখালেখি করতে চান। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল লেখার মাধ্যমে আদিবাসী মানুষের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সমাজের নানা ইতিবাচক দিকও তুলে ধরতে চান তিনি।
বিশেষ করে সাঁওতাল সমাজের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকগান, উৎসব, ঐতিহ্য, সামাজিক জীবন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের ভাবনা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।
তাঁর প্রত্যাশা, একদিন তাঁর লেখালেখি বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছাবে এবং আদিবাসী সমাজের মানুষের কথা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
সংস্কৃতি সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
মিলন মার্ডী মনে করেন, শুধু একজন বা কয়েকজন মানুষের উদ্যোগে কোনো সংস্কৃতি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার, সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, লেখক, শিল্পী ও তরুণ প্রজন্ম—সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি চান, সাঁওতাল ভাষায় আরও বেশি বই, কবিতা, গল্প ও গান সৃষ্টি হোক। শিশু-কিশোরদের নিজস্ব ভাষা শেখানোর পাশাপাশি নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানানো হোক। একই সঙ্গে আদিবাসী শিল্পী ও লেখকদের জন্য আরও বেশি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
নিজের লেখনী, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের দায়িত্ব—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান মিলন মার্ডী। তাঁর স্বপ্ন, একদিন আদিবাসী সমাজের নতুন প্রজন্ম নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করবে এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে।
লেখালেখির জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করার পাশাপাশি আদিবাসী সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের কথা তুলে ধরাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
মিলন মার্ডীর বিশ্বাস—নিজের শেকড়কে যত বেশি জানা ও ভালোবাসা যাবে, ততই নিজের ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। আর সেই শেকড়ের গল্পই তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চান।

