আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে ধামসা,মাদলের নীরবতা।
✍🏻 মিলন মার্ডী
আদিবাসী সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, সুর (রাহা) ও নৃত্যের সাথে সাঁওতাল সমাজের শিকড়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১ লক্ষ ২৯ হাজার সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের ‘আরি-চারি’ বা কৃষ্টি-সংস্কৃতি। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাব এবং মূলধারার সংস্কৃতির চাপে এসব ঐতিহ্যবাহী উপাদান চর্চা কমে যাওয়ার ফলে সাঁওতাল সমাজে তৈরি হচ্ছে গভীর আতঙ্ক ও সংকট।
সাঁওতাল সংস্কৃতিতে প্রতিটি উৎসব ও পার্বণের জন্য পৃথক সুর (রাহা), নৃত্য (এনেচ) এবং নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্র নির্ধারিত থাকে।
তুমদা (মাদল) ও টামাক (নাগরা)সাঁওতাল সঙ্গীতের মূল স্পন্দন। মাদলের গম্ভীর শব্দ এবং টামাকের তাল সাঁওতালদের ঐক্য ও যৌথ শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
তৈরিয়ৌ (বাঁশি) ও ফেনটড় বানাম/রেতা বানাম (দোতারা/সারিন্দা)সাঁওতাল জীবনের প্রেম, প্রকৃতি ও বিরহের প্রকাশ ঘটায় এই সুরের মূল যন্ত্রগুলোর মাধ্যমে।
রাহা ও তালের বৈচিত্র্য রয়েছে যেমন (তাহা রেতা নানা তারনা) স্বরগ্রামের ওপর ভিত্তি করে দোং রাহা (বিয়ে), সহরায় রাহা (ফসল কাটার উৎসব), বাহা রাহা (বসন্ত উৎসব), দাসায় রাহা (পূজা ও শোক) এবং লাগড়ের মতো প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি সুরের বৈচিত্র্য বিদ্যমান। নির্দিষ্ট সুরের তালে সাঁওতালদের নাচ ও গানের ধরনও আলাদা হয় তবে ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র ও সুরের চর্চা কমে যাওয়ার ফলে বর্তমানে সাঁওতাল সমাজে যেসব পরিবর্তন ও সংকট দেখা দিচ্ছে আত্মপরিচয়ের সংকট বাদ্যযন্ত্র কেবল আনন্দের উপাদান নয়, এটি একটি জাতির পরিচয় বহন করে। মাদল, বানামের বা (হারমুনিয়াম)শব্দ বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতাল গানের নিজস্ব রূপ হারিয়ে যায়, যার ফলে তরুণ প্রজন্ম তাদের মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিচয় চিনতে ব্যর্থ হচ্ছে।
নিজ ভাষায় (সিরিং ও এনেজে) অনীহা আসে যখন গানের সুর ও ছন্দ বিকৃত বা হারিয়ে যায়, তখন ভাষার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বা ভিনজাতীয় সুরের প্রভাবে সাঁওতাল তরুণদের মধ্যে নিজ ভাষায় গান গাওয়া (সিরিং) এবং দৈনন্দিন জীবনে সাঁওতালি ভাষায় কথা বলার (রড়রপড়/গালমারাও) প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
আরি-চারি (কৃষ্টি-সংস্কৃতি) বাহা, সহরায় কিংবা দাসায় উৎসবগুলো যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয় এবং সঠিক বাদ্য ও সুরের অভাব ঘটে, তবে এসব উৎসবের পেছনে থাকা সামাজিক মূল্যবোধ ও ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পথভ্রষ্টতা নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম দুর্বল হয়ে পড়ায় সাঁওতাল যুবসমাজ অন্য ভাষার অপসংস্কৃতি ও মূলধারার বিনোদনে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। এতে করে একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী শিকড়হীন হয়ে পরিচয়বিহীন সত্তায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে এ থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে সাঁওতাল সংস্কৃতির সত্তা ও শিকড় টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেমন
প্রতিনিয়ত চর্চা ও অনুষ্ঠান আয়োজন গ্রামে গ্রামে তরুণদের নিয়ে নিয়মিত গালমারাও (কথোপকথন), সিরিং (গান) এবং এনেচ (নৃত্য)-এর আসর বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ও তুমদা, টামাক, তৈরিয়ৌ এবং বিশেষ করে বানাম বাদকদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
হারিয়ে যেতে বসা ৫০টিরও বেশি ‘রাহা’ (সুর) এবং গানগুলো রেকর্ড করে আধুনিক ভাবে সংরক্ষণ করা যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগুলো শিখতে পারে এবং জীবনে ধারণ করতে সক্ষম হয়। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকার সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করা এবং বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে সাঁওতালদের মৌলিক যন্ত্রসহ পরিবেশনার সুযোগ তৈরি করা।
সংস্কৃতিই একটি জাতির প্রাণ। সাঁওতাল সমাজকে তার নিজস্ব শেকড় ও অস্তিত্বে টিকিয়ে রাখতে হলে সঙ্গীত, নৃত্য, ভাষা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া কোনো বিকল্প কিছুই নেই।

