শামুক আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, তাহলে খেতে বাধা কেন? আদিবাসীদের খাদ্যসংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রের কাছে দাবি
শান্ত পাহান, ঠাকুরগাঁও:বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যুগ যুগ ধরে তাঁরা নদী, খাল, বিল, পুকুর ও জলাশয়ের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে আসছেন। তাঁদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম একটি অংশ হলো শামুক। পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী পরিবারের মানুষ খাল-বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে রান্না করে খেয়ে আসছেন। এটি তাঁদের কাছে শুধু একটি খাবার নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
সম্প্রতি নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিলে শামুক নিধন রোধে প্রশাসনের অভিযানের খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ৪ নভেম্বর চলনবিলের ডাহিয়া ও সাতপুকুরিয়া এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পরিবেশকর্মীরা অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে তিনজন শামুক ব্যবসায়ীকে সাত দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ সময় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি শামুক উদ্ধার করে চলনবিলের উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়।
প্রশাসনের দাবি, চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং অতিরিক্ত শামুক-ঝিনুক নিধন বন্ধ করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগকে আমরা সম্মান করি। আমরাও চাই প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকুক, জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাক। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের প্রশ্ন—আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির অধিকার কোথায়?
শামুক শুধু খাবার নয়, আমাদের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ
আমাদের অনেক আদিবাসী পরিবারের মানুষ নিজেদের খাবারের প্রয়োজন মেটাতে খাল-বিল থেকে অল্প পরিমাণে শামুক সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেই শামুক রান্না করে খেয়ে থাকেন। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের অংশ।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, নিজেদের পরিবারের খাবারের জন্য শামুক সংগ্রহ করাও কি অপরাধ? হাজার হাজার কেজি শামুক বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা এবং একটি পরিবার নিজেদের খাবারের জন্য সীমিত পরিমাণে শামুক সংগ্রহ করা কি একই বিষয়?
আমরা মনে করি, এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। বাণিজ্যিকভাবে নির্বিচারে শামুক নিধন বন্ধ করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই অজুহাতে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সংবিধানে সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং বৈষম্যবিরোধী নীতির কথা বলা হয়েছে।
তাহলে রাষ্ট্র যখন আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে, তখন আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির বিষয়টি কেন যথাযথ গুরুত্ব পাবে না?
আমাদের পোশাক, নাচ, গান, উৎসব ও সামাজিক রীতিনীতিকে যদি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া খাদ্যাভ্যাস কেন সেই স্বীকৃতির বাইরে থাকবে?
আমাদের অস্তিত্ব কি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যকেও সম্মান করা হবে?
পরিবেশ সংরক্ষণ হোক, খাদ্যসংস্কৃতিও সুরক্ষিত থাকুক
আমরা কখনোই প্রকৃতি ধ্বংসের পক্ষে নই। শামুক জলজ পরিবেশের ভারসাম্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে ভূমিকা রাখে। তাই নির্বিচারে শামুক নিধন বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
তবে পরিবেশ সংরক্ষণের নামে আদিবাসীদের পারিবারিক খাদ্যসংগ্রহের ঐতিহ্য যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক শামুক আহরণ এবং পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণের জন্য সীমিত পরিমাণে শামুক সংগ্রহের মধ্যে সুস্পষ্ট আইনি পার্থক্য নির্ধারণ করা হোক।
এ বিষয়ে আদিবাসী সংগঠন, পরিবেশবিদ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রচলিত আইনে কোথায় কী বিধিনিষেধ রয়েছে, তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
আমার প্রতিবাদ, আমার অধিকার, আমার অস্তিত্ব
আজ আমি আমার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও খাদ্যসংস্কৃতির কথা বলার জন্য কলম ধরেছি। এই লেখার কারণে যদি সরকার আমাকে গ্রেফতার করে, জেলে পাঠায়, তাতেও আমি রাজি আছি। আমাদের আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও অধিকার নিয়ে কথা বলা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে আমি সেই শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত।
কিন্তু আমার প্রশ্ন, নিজের জাতির অধিকার ও ঐতিহ্যের পক্ষে কথা বলা কি অপরাধ? আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহ্যবাহী খাবার শামুক খাওয়ার অধিকার কেন বাধাগ্রস্ত হবে? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? আমাদের কি নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার নেই?
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমরা পরিবেশ ধ্বংস করতে চাই না। আমরা নির্বিচারে শামুক নিধনও চাই না। আমরা চাই প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকুক। কিন্তু নিজেদের পরিবারের খাবারের জন্য খাল-বিল থেকে সীমিত পরিমাণে শামুক সংগ্রহ করে খাওয়ার কারণে আদিবাসী মানুষ যেন অযথা হয়রানি কিংবা অযৌক্তিক শাস্তির শিকার না হন।
প্রয়োজনে আমার এই লেখার জন্য আমাকে গ্রেফতার করুন, জেল দিন, শাস্তি দিন—আমি আমার শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেবেন না। আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার শামুক খাওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্র যেন অযৌক্তিক বাধা প্রদান না করে।
নিজের জাতির অধিকার, মর্যাদা ও সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলা আমার কাছে কোনো অপরাধ নয়; এটি আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি আমার জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে নীরব থাকতে চাই না।
সরকারের কাছে আমাদের আবেদন
আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই—
১. আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে হবে।
২. পারিবারিক খাদ্যচাহিদা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক শামুক আহরণের মধ্যে সুস্পষ্ট আইনি পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে।
৩. পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক অধিকার ও জীবনযাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
৪. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৫. জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
শেষ কথা: আমাদের খাবার, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অস্তিত্ব
আমরা এই দেশেরই মানুষ। এই দেশের মাটি, জল, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্ক বহু পুরোনো। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, পোশাক, উৎসব ও জীবনযাপন আমাদের জাতিগত পরিচয়ের অংশ।
আমরা চাই না চলনবিলের শামুক নির্বিচারে নিধন হোক। আবার এটাও চাই না, পরিবেশ সংরক্ষণের নামে আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাপনের অধিকার উপেক্ষিত হোক।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের আবেদন—পরিবেশ রক্ষা করুন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করুন, কিন্তু আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক অধিকারকেও সম্মান করুন।
শামুক আমাদের কাছে শুধু খাবার নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া খাদ্যসংস্কৃতির একটি অংশ। আমাদের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে আমাদের অস্তিত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
আমাদের দাবি একটাই—প্রকৃতি বাঁচুক, আদিবাসীদের সংস্কৃতি বাঁচুক, আমাদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের অধিকার সুরক্ষিত হোক।

