- ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: হারিয়ে যেতে বসা কুড়মালি ভাষাকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার চর্চা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় চালু হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা উদ্যোগ ‘কুড়মালি পাঠশালা’। কুড়মালি ভাষার লেখক, গবেষক ও ভাষাকর্মী উজ্জ্বল মাহাতোর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই পাঠশালায় মাহাতো জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের তাদের মাতৃভাষা শেখানো হবে।
উজ্জ্বল মাহাতোর দাবি, এটিই বাংলাদেশের প্রথম কুড়মালি ভাষার পাঠশালা। গত শনিবার সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার পশ্চিম আটঘরিয়া গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠশালাটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
দেশের সমতলের অন্যতম নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী মাহাতো সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা কুড়মালি। তবে জনসংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে মাতৃভাষার ব্যবহার কমে যাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাষা শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকাসহ নানা কারণে কুড়মালি ভাষাটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতিতে মাহাতো জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভাষার সঙ্গে পরিচিত করা, ভাষাটির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের ভাষাগত ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘কুড়মালি পাঠশালা’।
প্রাথমিকভাবে পশ্চিম আটঘরিয়া গ্রামের চতুর্থ শ্রেণি থেকে মাধ্যমিকের নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী পাঠশালাটিতে ক্লাস করবে। এখানে শিক্ষার্থীদের কুড়মালি ভাষার বর্ণ, শব্দ, উচ্চারণ, কথোপকথন এবং দৈনন্দিন জীবনে ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হবে।
মাহাতো জনগোষ্ঠীর বসবাস সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁসহ দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ৩৩টি উপজেলায় রয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী তাদের জনসংখ্যা ২০ হাজারের ঘরে থাকলেও মাহাতো গবেষক ও সম্প্রদায়ের অনেকের মতে, দেশে মাহাতো জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৩৬ থেকে ৪০ হাজার হতে পারে।
সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও সলঙ্গা অঞ্চল এবং বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলায় মাহাতো জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের বসবাস রয়েছে। সম্প্রদায়ের অনেকের মতে, তাদের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলা এবং বর্তমান ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় ছিল।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মাহাতো কুর্মী গোত্রভুক্ত। এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮১টি গোত্রের উল্লেখ থাকলেও নামের শেষে ‘মাহাতো’ ব্যবহারের কারণে তারা সাধারণভাবে মাহাতো নামেই বেশি পরিচিত।
মাহাতো সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি ধারণাও প্রচলিত রয়েছে যে, ঢাকার কুর্মিটোলা এলাকার নামকরণের সঙ্গে অতীতে কুর্মী জনগোষ্ঠীর বসতির সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও ঐতিহাসিক ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
উজ্জ্বল মাহাতোর এই উদ্যোগকে মাহাতো জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ভাষাপ্রেমী ও সম্প্রদায়ের সদস্যরা। তাদের মতে, একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান, স্মৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘কুড়মালি পাঠশালা’র মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের মাতৃভাষা শিখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়, তাহলে হারিয়ে যেতে বসা ভাষাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার পথ আরও সুগম হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাতৃভাষা রক্ষার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য মাহাতো অধ্যুষিত এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে এবং কুড়মালি ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে—এমন প্রত্যাশা মাহাতো জনগোষ্ঠীর।
ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই কুড়মালি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার এই উদ্যোগ শুধু একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মাহাতো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ