স্টেশনের ‘ধুলোমাখা নক্ষত্র’ ও এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উপাখ্যান: যেখানে পথশিশুরাই পরম আপন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ফিসার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬ । ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। স্টেশনের কংক্রিট থেকে বেরিয়ে আসা ভাপসা গরম আর ট্রেনের হুইসেলের সাথে ছুটে চলা মানুষের হুড়োহুড়ির মাঝেই এক অন্যরকম দৃশ্য। প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় একটি বয়স্ক ছাতিম গাছের ছায়ায় গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত মায়ার জগৎ। সমাজের চোখে যারা কেবলই ‘টোকাই’ বা ‘আবর্জনা’, তারাই সেখানে হয়ে উঠেছে এক একজন ‘ধুলোমাখা নক্ষত্র’। আর এই নক্ষত্রদের বুকে আলো জ্বালানোর নিঃস্বার্থ কারিগর এক তরুণ, নাম তার পল্লব।

মো. লতিফুর রহমানের লেখা ‘ধুলোমাখা নক্ষত্র’ গল্পের এই বাস্তব চিত্রটি যেন আমাদের সমাজেরই এক লুক্কায়িত অধ্যায়, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পথশিশুদের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা পাহাড়সমান ভালোবাসার কথা।

​ড্যান্ডির নেশা থেকে স্বপ্নের পাঠশালায়
​ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে না ছুটে পল্লব নিজের সময়, শ্রম ও ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছেন স্টেশনের এই অবহেলিত পথশিশুদের জন্য। মাত্র কয়েকমাস আগেও আট-নয় বছরের সেলিম বা রকির হাতে খাতা-কলমের বদলে থাকতো হলুদ পলিথিন। ক্ষুধা আর একাকিত্ব ভুলতে ড্যান্ডির বিষাক্ত নেশায় তারা খুঁজতো বেঁচে থাকার সান্ত্বনা। কিন্তু পল্লব তাদের সেই অন্ধকার থেকে টেনে এনেছেন। ড্যান্ডি কেড়ে নিয়ে হাতে তুলে দিয়েছেন রংপেন্সিল ও বই, শিখিয়েছেন আকাশের মতো বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে।

আজ সেলিম প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে চক দিয়ে বড় একটি বাড়ির ছবি আঁকে। পল্লব জানতে চাইলে মায়াভরা চোখে সে বলে ওঠে, “এটা আমাদের বাড়ি, পল্লব ভাই। আমরা সবাই একসাথে থাকবো এই বাড়িতে। কেউ আমাদের তাড়ায়ে দিবে না।” পাশেই হয়তো সুমন নামের আরেক শিশু কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই আপন মনে গেয়ে ওঠে দরদভরা গান— “আমার ভিতর ও বাহিরে অন্তরে অন্তরে, আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…”

​১০ টাকার নোটে জীবনের মূল্য
​সম্প্রতি স্টেশনের এই খোলা আকাশের পাঠশালায় ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক অথচ ভালোবাসায় মোড়ানো ঘটনা। প্রচণ্ড গরমে বাচ্চাদের পড়াতে পড়াতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন পল্লব। মাথা ঘুরে ছাতিম গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে জ্ঞান হারান তিনি।

​মুহূর্তেই যেন থমকে যায় বাচ্চাগুলোর পৃথিবী। যে যার মতো দিশেহারা হয়ে ছুটে আসে। কেউ স্টেশনের টিউবওয়েল থেকে ভাঙা বোতলে পানি আনে, কেউ নিজের গায়ের ময়লা শার্ট খুলে পল্লবের মুখে বাতাস করতে থাকে। ছোট্ট রকি তার পকেটে সযত্নে জমিয়ে রাখা একটি মুচড়ানো দশ টাকার নোট বের করে বন্ধু সুমনের হাতে দিয়ে বলে—

​”তুই জলদি যা, ফার্মেসি থেইকা পল্লব ভাইয়ের জন্য ওষুধ নিয়া আয়। ভাইরে বাঁচাইতে হইবো!”

​আর সেলিম কাঁদতে কাঁদতে পল্লবের শার্টের কলার ধরে ঝাঁকিয়ে বলতে থাকে, “ভাই, তুমি এমন করতেছো ক্যান? তোমার কিছু হইলে আমরা কার কাছে যামু? আমাদের তো তুমি ছাড়া কেউ নাই ভাই!”

পল্লবের জ্ঞান ফেরার পর আট-দশটা ঘামে ভেজা, ধুলোমাখা মুখের কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য প্রমাণ করে, এই শিশুরা কতটা আপন করে নিতে পারে। ঘাম আর চোখের পানিতে একাকার হয়ে যাওয়া আলিঙ্গনে পল্লব বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে বলেন, “তোরা থাকতে আমার কিছু হতে পারে নাকি? তোরাই তো আমার সব।”

সমাজের প্রতি একটি বার্তা
​এই পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়, এরা আমাদেরই সন্তান। মো. লতিফুর রহমানের এই গল্প আমাদের এক গভীর বার্তা দেয়—স্টেশনে, ট্রাফিক সিগন্যালে বা ফুটপাতে থাকা মলিন চেহারার এই শিশুদের দিকে একবার ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেখুন। একটু ভরসা পেলে এই শিশুরাই নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় আপনার পৃথিবী ভরিয়ে দিতে পারে।

​পল্লবের স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়, সে শুধু চায় ড্যান্ডির বিষাক্ত ধোঁয়ায় নয়, এই অবহেলিত নক্ষত্রগুলো বড় হয়ে উঠুক শিক্ষার আলোয়। ছাতিম গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা বিকেলের রোদে এই শিশুদের চিকচিক করা চোখের পাতাগুলো যেন বলছে—ওরাও পবিত্র, সুন্দর এবং অনন্ত সম্ভাবনাময়। সমাজের কাছে একটাই অনুরোধ, ওদের একটু ভালোবাসুন।

সম্পাদক : মুহাম্মদ রুবেল মিয়া , নির্বাহী সম্পাদক : এম এইচ আরমান ।  কপিরাইট ©২০১৩-২০২৬ একুশে বার্তা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন