প্রতিবাদে লেখক শান্ত পাহানের তীব্র নিন্দা
লেখক: শান্ত পাহান (ঠাকুরগাঁও):বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া কয়েকটি বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলার লেখক শান্ত পাহান। একই সঙ্গে তিনি দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের ঐতিহাসিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই।” অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক।”
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের অধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এসব বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লেখক শান্ত পাহান বলেন, “আমাদের নিজেদের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে। আমাদের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়। আমরা এ দেশের আদি কালের বাসিন্দা—আমরা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিই। আমাদের এই পরিচয় কোনো নতুন দাবি নয়; এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।”
তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমরা মানছি যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আমাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। রাষ্ট্রীয় নথিতে আমাদের অনেককে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোনো একটি পরিভাষা দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা যায় না।”
শান্ত পাহান আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও বিভিন্ন সরকারি নথিতে দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি স্বীকৃত রয়েছে। সরকারিভাবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সব জাতিসত্তার মানুষের পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তালিকা, পরিচয় ও অধিকার নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা রয়েছে।
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশের সব জাতিসত্তার মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও তাদের পরিচয় যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়েছে—এমনটি বলা কঠিন। অনেক জনগোষ্ঠী এখনও সরকারি তালিকা ও স্বীকৃতির কাঠামোর বাইরে বা অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে। তাই পরিচয় অস্বীকার না করে সরকারিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।”
শান্ত পাহান বলেন, বাংলাদেশের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁওসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ যুগের পর যুগ এই ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছেন এবং দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং জাতিগত পরিচয় এক বিষয় নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় বহন করতে পারেন। বাঙালি যেমন বাংলাদেশের নাগরিক, তেমনি সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁওসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষও বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিকত্বের জায়গায় আমরা সবাই সমান, কিন্তু জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জায়গায় প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।”
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতিগত পরিচয়ের মর্যাদাও আমরা চাই। সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতির কোনো বিরোধ নেই। বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমঅধিকার নিশ্চিত করেই একটি শক্তিশালী ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”
শান্ত পাহান আরও বলেন, কোনো জাতিসত্তার পরিচয়কে অস্বীকার বা প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্য না দিয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার আলোকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পুনর্বিবেচনা করে দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের অনুভূতি, মর্যাদা ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান।
সবশেষে লেখক শান্ত পাহান বলেন, “কোনো জাতিসত্তার পরিচয় অস্বীকার নয়—বরং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করেই সমঅধিকার, মর্যাদা ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। আমরা রাষ্ট্রের অংশ, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক; একই সঙ্গে আমরা আমাদের নিজস্ব জাতিসত্তার মানুষ। এই দুই পরিচয় পাশাপাশি বহন করাই আমাদের বাস্তবতা।”

